কসউবি’র ১৪২ বছর

ক্লাসের পেছন সারির লজ্জা, সিরাজ স্যারের মারের ‘সুনামি’

coxsbazar

এটি একটি প্রতীকী ছবি। ঠিক এভাবে বিজ্ঞানাগারের ঠিক এই জায়গাতেই সিরাজ স্যারের মারের ‘সুনামি’ চলেছিল! ছবিটি  ২৫ ডিসেম্বর ২০১৬ কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৪২ বছর পূণর্মিলনীর দিনে তোলা।

প্রাইমারি শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিকের প্রথম ক্লাস ৬ষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৮৮ সালে। কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগে আমি জানতামই না এই নামে কোন স্কুল আছে। আমার সেই সময়ের প্রাইভেট টিউটর ফারুক স্যারই আমাকে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তিনিই আমার জন্য ভর্তি ফরম কেনা, ফরম পূরণ করে জমা দেয়ার কাজটিও করেছিলেন। এই মানুষটি না হলে হয়তো আমি জানতেই পারতাম না ৬ষ্ট শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার জন্য কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় নামের গৌরবান্বিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্টান আছে। ফারুক স্যার, এই মানুষটির কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তিনি পথ দেখিয়েছিলেন বলেই তো এখন আমার পরিচয় দিতে পারছি, আমি একজন ‘কসউবিয়ান’!

ক্লাসে ‘বৈষম্য’
ভর্তি পরীক্ষায় অনেকগুলো ভর্তিচ্ছুর মাঝে আমি ১৫ নাম্বারে পাস করলাম। ভর্তি হয়ে যখন ক্লাস শুরু হবে তখন আমি পড়লাম ‘এ’ সেকশানে। বেজোড় সংখ্যার রেজাল্টধারিরা ‘এ’ সেকশানে, আর জোড় সংখ্যার রেজাল্টধারিরা পড়লো ‘বি’ সেকশানে। আর ক্লাসে আমার রোল নাম্বার হলো ৮।
৬ষ্ট শ্রেণীতে আমাদের ক্লাসে দুই সারিতে বেঞ্চ পাতা ছিল। ক্লাস টিচার …… আপা (এই নামটি আমি বলতে চাই না) ঠিক করলেন বেঞ্চের প্রথম কাতারে এক থেকে চার, আর পাঁচ থেকে আট নাম্বার রোলধারি ছাত্ররা বসবে। বাকিরা সেই ক্রমানুসারে পেছনে বসার কথা। ওই টিচারের ঠিক করা বিধান মতে আমার বসার কথা প্রথম সারির দ্বিতীয় বেঞ্চে। কিন্তু না, আমাকে হতাশ ও হতবাক করে দিয়ে আমাকে প্রথম সারি থেকে তুলে দিয়ে পেছনের সারিতে বসিয়ে দিলেন তিনি! সুন্দর চেহারা আর টসটসে গড়নের আরেক ছাত্রকে আমার জায়গায় এনে বসালেন।
সেই প্রথম আমি জানলাম, স্কুলেও ‘বৈষম্য’ আছে! আর আমি সেই বৈষম্যের শিকার হলাম! আমার কী অপরাধ? আমার চেহারা সুন্দর ছিল না! আমার বাবার বড় কোন পরিচয় নেই! ভালো বংশ মর্যাদা নেই!
আমি আজও সেই শ্রদ্ধেয় টিচারকে ক্ষমা করতে পারিনি।

coxsbazar-1

হাজিরা খাতায় কালি আর সিরাজ স্যারের ‘পিটুনি’
এটি ৮ম শ্রেণীর ঘটনা। আমাদের স্কুলের সিডিউল ক্লাস সিডিউল ছিল সকাল ১০টা থেকে বেলা একটা, আর বেলা দুইটা থেকে বিকাল ৪টা। মাঝখানে একঘন্টার লাঞ্চ বিরতি।
আমাদের সময়ে দুপুরে লাঞ্চে গেলে অনেক ছাত্রই আর আসতো না। এই ক্লাস ফাঁকি মাঝে মাঝে আমিও করতাম। এই ক্লাস ফাঁকি রোধ করতে লাঞ্চ বিরতির পর প্রথম ক্লাসেই নতুন করে হাজিরা খাতায় নাম ডাকা হতো। আর যারা মিস করতো তাদের শাস্তি। কিন্তু মাঝে মাঝে আবার নাম ডাকা হতো না।
তেমনই একদিন। অনেক ছাত্র লাঞ্চের ছুটির পর আর ক্লাসে ফিরে আসেনি। টিচারের টেবিলে হাজিরা খাতা এনে রাখা হয়েছে। সাথে দোয়াত আর কলম। কিন্তু সেই ক্লাসে কোন টিচার এলেন না। আমার গেলো মাথা খারাপ হয়ে! ‘আমি যখন ফাঁকি দিই তখন নাম ডাকা হয়! অন্যরা যখন ফাঁকি দেয় তখন নাম ডাকা হয় না!’
আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। যারা দুপুরের পর আর ক্লাসে ফিরে এলো না তাদের হাজিরায় ‘এ’ চিহ্ন নিজেই দিয়ে দেবো। দোয়াতে কলম চুবিয়ে ফাঁকিবাজদের হাজিরায় ‘এ’ লিখতে গিয়ে একজনের হাজিরায় বেশি কালি পড়ে খাতা লেপটে গেলো। ‘এখন কী করা যায়? টিচার দেখলে তো পিটের আস্ত থাকবে না।’ টিচারের পিটুনি থেকে বাঁচতে ওই কালি মুছে ফেলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু ওই যে, বিপদ যখন আসে চারদিক দিয়েই আসে। কালি মুছতে গিয়ে হাজিরা খাতার ওই অংশটিই ছিঁড়ে গেল। এখন আর বাঁচায় কে!
পরদিন সেই বিপদটি আসলো। আমাদের ক্লাস টিচার ছিলেন সিরাজ স্যার (এসএম সিরাজুল ইসলাম)। তিনি হাজিরা খাতার অবস্থা দেখে গেলেন ক্ষেপে। তিনি সবার কাছে জানতে চাইলেন, এই কাজ কে করলো। সবাই চুপচাপ। কেউ কোন জবাব দিচ্ছে না। তিনি এবার সবাইকে পিটুনির ‘হুমকি’ দিলেন। সবাইকে সিরাজ স্যারের পিটুনি থেকে বাঁচাতে ভয়ে ভয়ে আমি নিজের দোষ স্বীকার করে নিলাম।
আমার উপর নেমে এলো পিটুনির মহাঘূর্ণিঝড়! তখন ৮ম শ্রেণীর ক্লাস হতো দক্ষিণ পাশের ভবনের পূর্ব পাশের দু’তলায়। সিরাজ স্যার আমাকে ক্লাস থেকে নামিয়ে নিচে নিয়ে আসলেন। ক্লাসের নিচতলাতে ছিল বিজ্ঞানাগার। তিনি আমাকে বিজ্ঞানাগারের সামনের দেয়ালে পেছন ফিরে দাঁড় করালেন। হাত দু’টোকে দুইপাশে প্রসারিত করে দেয়ালের সাথে লেপটে দাঁড়াতে বললেন। এবার শুরু হলো ‘মার’! আর সে কী ‘মার’। আমাকে মারতে মারতে একটি বেত পুরোটাই ভেঙ্গে ফেললেন। আর ক্লাসে ফিরে বললেন, আমাকে মারতে মারতে নাকি তাঁর হাতই ব্যথা হয়ে গেছে। এখন তাঁর ব্যথার চিকিৎসার টাকা আমাকেই দিতে হবে!
সিরাজ স্যারের ওই মারের কথা আমার অনেকদিন মনে ছিল। এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়লে নিজেই মনে মনে হেসে ফেলি।

স্কুল ম্যাগাজিন ও ফান্ড সাবাড়ের গল্প
আমি তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। আমাদের প্রতিবছর ভর্তির সময় বাৎসরিক কিছু ফি’র সাথে স্কুল ম্যাগাজিনের একটি ফি’ও নেয়া হয়। কিন্তু কখনোই ওই ম্যাগাজিন বের হয়নি। আমরা ঠিক করলাম, স্কুল ম্যাগাজিনটা বের করবো। সেই অনুযায়ী হেড টিচারকে প্রস্তাবটা আমিই দিলাম। তখন আমাদের ক্লাস টিচার ছিলেন মমতাজ স্যার (মমতাজ আহমদ)। তিনি খুশি হয়েই প্রস্তাব লুফে নিলেন। সব শিক্ষকের উপস্থিতিতে স্কুল ম্যাগাজিনের প্রস্তাব নিয়ে মিটিং ডাকা হলো। একটি কমিটিও করা হলো। এবার নিশ্চয় স্কুল ম্যাগাজিন বের হবে!
কিন্তু ম্যাগাজিন আর বের করা হয়নি। আমরা তখন সিরাজ স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তাম। বিকালে যখন তাঁর কাছে প্রাইভেট পড়তে গেলাম তিনি তো আমার উপর রেগে আগুন! আমাকে বেশ কিছুক্ষণ ঝাড়লেন! তাঁর মোদ্দা কথায় যা বুঝলাম, স্কুলের যত ফান্ড ব্যাংকে জমা আছে তার সবক’টাই খেয়ে ফেলা হয়েছে! বাকি আছে কেবল ম্যাগাজিন ফান্ড! আমার প্রস্তাবের কারণে ওই ফান্ড সাবাড় করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া হচ্ছে!
সিরাজ স্যারের ওই বকুনি খেয়ে আর স্কুল ম্যাগাজিনের ব্যাপারে আর এক পা-ও আগানো গেলো না। সিরাজ স্যার আমাকে এই বলেই শাসালেন, আমি ‘বেশি কাবিল’ হলাম কিনা!
ওই ঘটনার পর আজ পর্যন্ত স্কুল ম্যাগাজিনটি আর বের করা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

সেই ছোট্ট চারা গাছ এখন মহিরুহ
হেড টিচার মমতাজ স্যার বৃক্ষ রোপনের উদ্যোগ নিলেন। বড় ক্লাসের ছাত্ররা অন্তত একটি করে গাছের চারা রোপন করবে। আমিও যোগ দিলাম বৃক্ষরোপন কর্মসূচিতে। এখন যেখানে প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের কক্ষ তার পেছনে আমি দুইটি চিকন পাতা ইউক্লিপটাস গাছের চারা রোপন করলাম।
সেটি ১৯৯১ নয়তো ১৯৯২ সালের কথা। আর সেই ছোট্ট চারা এখন মহিরুহ হয়ে উঠেছে। আমি যে দুইটি চারা রোপন করেছিলাম তার স্থান এখনও আমার মনে উজ্জল হয়ে রয়েছে। তার একটি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। আরেকটি গাছ এখনও ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কোন ছাত্র কোন চারা লাগিয়েছিল তার কোন ফলক ছিল না। তেমনি আমার চারারও নেই। কিন্তু আমি জানি, কোন চারাটি আমি রোপন করেছিলাম। প্রধান শিক্ষক আর শিক্ষক কক্ষের ঠিক মাঝ বরাবর পশ্চিম পাশে রাস্তার ধারে দেয়াল ঘেষে আমার রোপন করা একটি চারা গাছে এখন বিশাল গাছে পরিণত হয়েছে।
আমি যখন ওই রাস্তা দিয়ে যাই তখন ওই গাছটি আমি দেখি, আর মনে মনে বলি, ওই তো আমার রোপন করা গাছ! ওই গাছটি এতো বড় হয়েছে যে, যদি দুই হাত গাছটিকে জড়িয়ে ধরি হয়তো পুরো গাছটা জড়িয়ে ধরতে পারবো না!

২৩ নভেম্বর ২০১৬
ই-মেইল: ansar.cox@gmail.com

লেখক: আনছার হোসেন, সম্পাদক ও প্রকাশক, কক্সবাজার ভিশন ডটকম, নির্বাহী সম্পাদক ও বার্তা প্রধান, দৈনিক সৈকত এবং ১৯৯৩ ব্যাচ, কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়।

কক্সবাজার ভিশন.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ
error: Content is protected !!