সম্পাদকের কলাম

‘কপি টু পেস্ট’ সাংবাদিকতা, আমি লজ্জিত আর পাঠক বিভ্রান্ত!

Ansar 01.04.2014 (Ukhiya Station)

সকালে ঘুম ভাঙ্গতেই জুনিয়র এক সহকর্মীর ফোন, ‘বড় ভাই, আজকের লোকাল পত্রিকা দেখেছেন!’ আমি স্বভাবসুলভই ‘না’ বললাম। তারপরই ওই সহকর্মীর উপর তার অধিকারটা খাটালেন, ‘আপনি কালকে আমাকে বকলেন! দেখেন, লোকাল পত্রিকার প্রায় সবক’টিতেই আপনার নিউজটি ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ বলে হুবুহু ছেপেছে!’ আমি এবার বুঝলাম, ওই সহকর্মী কেন আমার উপর অভিমানটা করছেন। একদিন আগে তাকে একটি নিউজ দিয়ে বলেছিলাম, এই নিউজ তোমার ওয়েবসাইটে দিতে পারবে, তোমার লোকাল পত্রিকায় নয়! কিন্তু সে নিউজটি হুবুহুই তার লোকাল পত্রিকাতে ছাপিয়ে দিয়েছিল বলেই তাকে একটু বখে দিয়েছিলাম! কিন্তু এখন সে সুযোগ পেয়েছে, তাই অভিমানটা ঝেড়ে নিলো!

এবার আসল ঘটনায় আসি। দৈনিক সৈকতের ৯ এপ্রিল সংখ্যায় ‘সৈকত ও বালিয়াড়ি দখল করে হোটেল ও রাস্তা / ৩ সচিব ও ডিসি-এসপিসহ ১০ কর্মকর্তাকে ‘বেলা’র আইনি নোটিশ’ শিরোনামে আমার লেখা একটি নিউজ লিড আইটেমে ছেপেছি। একই নিউজ আমার নামেই ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক আমার দেশ ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘বার্তা২৪.কম.বিডি’তেও ছাপা হয়েছে। নিউজটি আমারই লেখা ও সম্পাদিত। এই নিউজটি আমার দুই জুনিয়র সহকর্মীও আমার কাছ থেকে আবদার করে নিয়েছিলেন। স্বভাবতই এক সহকর্মীর লোকাল পত্রিকায় নিউজটি ছাপা হওয়ার কথা।

অন্য সহকর্মীর ঢাকার একটি পত্রিকায়ও ছাপা হবে। কিন্তু এই নিউজই যে কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত ১৩টি লোকাল পত্রিকায় ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ বলে ছাপা হবে, তা তো কল্পনায়ও থাকার কথা নয়! তাও আবার দাঁড়ি, কমা, হেডলাইন সবকিছুই একই রেখে, শুধু ক্রেডিট লাইনেই যা একটু রদবদল, ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’! এবার আসা যাক, কিভাবে এমন কান্ড ঘটল! এখন চলছে ডিজিটাল যুগ, তাই চুরিটাও ডিজিটালই হওয়ার কথা! সেই ডিজিটাল ‘চুরি’র শিকার হয়ে ‘কপি টু পেস্ট’ সাংবাদিকতার আরেকটি নজির সৃষ্টি হয়েছে। ‘বার্তা২৪.কম.বিডি’ অনলাইন নিউজ পোর্টাল থেকে নিউজটি কপি করে লোকাল পত্রিকাগুলো নিজেদের সাংবাদিকতা জাহির করার জন্য ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ বলেই লিড আইটেম, সেকেন্ড লিড কিংবা তিন কলামে নিউজটি কাভার করেছে! প্রিয় পাঠক, আমি খুবই লজ্জিত! আমার লেখা নিউজটিই তারা নিজেদের প্রতিবেদন বলে চালিয়ে দিয়েছে। এখানে বলে রাখা ভালো, এখন ডিজিটাল যুগ, উম্মুক্ত অনলাইন মিডিয়া! উম্মুক্ত অনলাইনের এই যুগে লোকাল পত্রিকার স্বার্থে আমিও প্রায়ই সময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিউজ ‘কপি, পেস্ট’ করি। কিন্তু যাদের নিউজ তাদের ক্রেডিট লাইনটা দিতে ভুলি না! এটা মনে করি, অন্তত এটুকু দায় তো স্বীকার করতেই হবে।

তাই বিডিনিউজের নিউজ হলে ‘বিডিনিউজ’, বাংলা নিউজের নিউজ হলে ‘বাংলানিউজ’ ক্রেডিট লাইন দিয়েই নিউজ ছাপি। কিন্তু একেবারে ‘চুরি’ করে নিজের নামে চালিয়ে দিই না! প্রথমে ভেবেছিলাম, এটার শিরোনাম দেবো, ‘চুরির সাংবাদিকতা’! কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে আমারও তো একটু দায় আছে, সাংবাদিক গোষ্টির ইজ্জত রক্ষা করার! তাই অনেক ভেবে শিরোনাম করেছি, ‘কপি টু পেস্ট’ সাংবাদিকতা! এই ‘কপি টু পেস্ট’ সাংবাদিকতার এই সময়ে যারা সত্যিকার সাংবাদিকতা করে তারা বড্ড বেকায়দায় আছেন। তাদের কোন নিউজ অনলাইন কোন মিডিয়ায় ছাপা হলেই ‘কপি টু পেস্ট’ হয়ে অন্য কোন ‘বিশিষ্ট’ সাংবাদিকের নামে একই নিউজ, একই হেডলাইনে, একই শব্দে, একই ছন্দে অন্য কোন মিডিয়ায় ছাপা হয়ে যাচ্ছে। পাঠক ওই নিউজ পড়ে, বুঝে নিতে বাধ্য, আহা! ওই রিপোর্টার কতো ভালো লেখেন! কিন্তু আমরাই জানি, যার নামে নিউজটি ছাপা হয়েছে, সে একটি লাইন লিখতে কতটা ভুল করেন, কতবার কলম বেঁকে যায়, কম্পিউটারে কতবার হাত কেঁপে যায়! আমি এমনও সহকর্মীর কথা জানি, যে আমার আরেক জুনিয়র সহকর্মীর কাছে জানতে চাইছেন, ‘আনছার ভাই কোন কোন অনলাইনে কাজ করে!’ কারণ কী জানেন, ওই ওয়েব পোর্টাল থেকে নিউজ ‘কপি টু পেস্ট’ করে সেই সহকর্মী তার ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিকে নিজের নামে পাঠাবেন, যেহেতু ওই পত্রিকা তাকে দয়া করে ‘বিশিষ্ট সাংবাদিক’ হিসেবে কক্সবাজার প্রতিনিধি নিয়োগ করেছেন! পাঠকদের আরেকটি ঘটনা বলি, আমি বেশ কিছুদিন ধরে ‘বার্তা২৪.কম.বিডি’তে কাজ করছি।

কিন্তু একদিন দেখি, জাতীয় একটি দৈনিক থেকে কক্সবাজারের একটি নিউজ ওই পত্রিকার প্রতিনিধির নামে ‘বার্তা২৪.কম.বিডি’তে আপলোড করা হয়েছে। কিন্তু যার নিউজ আমার অনলাইনে সেই পত্রিকার ক্রেডিটে ছাপা হয়েছে, সেই সাংবাদিককে তো আমি হাড়ে হাড়ে চিনি! একটি লাইন নিউজ তো লিখতে পারেই না, বরং মাসিক ভাড়ায় নিউজ লেখা ও পত্রিকায় পাঠানোর জন্য ‘সাংবাদিক’ নিয়োগ দিয়েছেন! অদ্ভুদ!!! এই লেখাটি লিখতে বসার আগে যে সব লোকাল পত্রিকায় আমার নিউজটি তাদের ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ ক্রেডিট লাইনে ছাপা হয়েছে সেই পত্রিকার একটির সম্মানিত সম্পাদককে ফোন করার ইচ্ছা ছিল। ফোন করে জানার ইচ্ছা ছিল, আপনার কোন্ ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ নিউজটি লিখেছেন! যেহেতু আমি জানি, ওই পত্রিকায় যারা কাজ করেন, তাদের মধ্যে কোন রিপোর্টার নেই যারা ওই ধরণের কোন প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেন। কিন্তু জুনিয়র সহকর্মীদের বাগড়ার মুখে আর ফোন দেয়া হয়নি। তাদের আবদার, ‘কী দরকার, ফোন করার!’ পাঠক, আমি লজ্জিত! মনের যন্ত্রণা থেকে এই লেখাটি লিখতে বাধ্য হয়েছি। অযাচিত কিছু লিখে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন, তবে পাঠকদের কাছেই এই ক্ষমা প্রার্থনা, সেই সকল ‘বিশিষ্ট’ সাংবাদিকদের কাছে নয়! পাদটিকা: যে নিউজটি নিয়ে এতো কথা সেই নিউজ তো আমার নামেই দৈনিক সৈকতে ছাপা হয়েছে, আর অন্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছে ‘নিজস্ব প্রতিবেদক’ ক্রেডিট লাইনে। এখন আমার যারা পাঠক তারা নিতান্তই বিভ্রান্ত, এটি কি আদৌ আমার লেখা নিউজ! আমি এখন কিভাবে তাদের বোঝাই! আরেকটি নোট: ১০ এপ্রিল, সকালে শুনলাম চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত আরেকটি পত্রিকায় ওই নিউজটি কক্সবাজার প্রতিনিধির ক্রেডিট লাইনে হুবুহু হেডলাইনসহ প্রথম পৃষ্টায় ছাপা হয়েছে। তাও আবার তিন কলামে লাল হেডলাইনে! আমি আবারও লজ্জিত হলাম।

আনছার হোসেন, কক্সবাজার থেকে প্রকাশিত দৈনিক সৈকতের নির্বাহী সম্পাদক ও বার্তা প্রধান এবং বার্তা২৪.কম.বিডি’র কক্সবাজারস্থ স্টাফ রিপোর্টার।

(বি:দ্র: লেখাটি ২০১৪ সালের কোন এক সময়ে লেখা। এটি দৈনিক সৈকত, কক্সবাজার নিউজ ডটকম, কক্সবাজার টাইমস ডটনেট ও বার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম বিডি অনলাইন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।)

কক্সবাজার ভিশন.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।




এই পাতার আরও সংবাদ
error: Content is protected !!